
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প বর্তমানে অন্যতম বৃহৎ ও দ্রুত বর্ধনশীল কৃষি-উৎপাদন খাত। ২০২৫ সালে এসে এই খাতে প্রচুর বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটেছে, তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে।
বর্তমান উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৪.৫ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়, সাপ্তাহিক ২ কোটি বাচ্চা মুরগি উৎপাদিত হয় এবং বছরে ৭৫-৮০ লাখ মেট্রিক টন ফিড তৈরি করা হয়। গত এক দশকে এই উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, ২০২৪ সালে অতিবৃষ্টি, খরা এবং পোল্ট্রি রোগবালাইয়ের কারণে অনেক খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
এই খাতে বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। দেশের লাখ লাখ মানুষ এই শিল্পের সাথে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত। ছোট ও মাঝারি খামারিদের পাশাপাশি বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ
১. খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি
মুরগির খাদ্য বা ফিডের মূল্য গত কয়েক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট, এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ফিডের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
২. রোগবালাই ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি
২০২৪ সালের দিকে বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু এবং নিউক্যাসল ডিজিজের মতো রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে অনেক খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উৎপাদন হ্রাস পায় এবং বাজারে ডিম ও মুরগির দাম অস্থির হয়ে ওঠে।
৩. বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি
অনেক পোল্ট্রি খামার বিদ্যুৎ-নির্ভর, বিশেষত ব্রয়লার খামারগুলোতে ২৪ ঘণ্টা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এই খাতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
৪. বাজারে অস্থিরতা ও প্রতিযোগিতা
বড় বড় প্রতিষ্ঠান বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার কারণে ছোট ও মাঝারি খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া, আমদানি করা মাংস ও ডিমের কারণে দেশীয় বাজারের প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে।
উন্নয়নের জন্য নেওয়া পদক্ষেপ
১. প্রযুক্তির ব্যবহার ও গবেষণা
বর্তমানে পোল্ট্রি শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, যেমন স্বয়ংক্রিয় ফিডিং সিস্টেম, ডিজিটাল তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জেনেটিক্যালি উন্নত জাতের মুরগি ইত্যাদি। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন উদ্যোগের ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতের মুরগি উৎপাদনের চেষ্টা চলছে।
২. সরকারের নীতিগত সহায়তা
বিদ্যুৎ বিলে ২০% রিবেটের দাবি উঠেছে, যা ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য সহায়ক হবে।
করমুক্ত ফিড আমদানি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পোল্ট্রি খাতে বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা এই খাতে বিনিয়োগ করতে পারে।
৩. রপ্তানি বাজারের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগোচ্ছে। কিছু কোম্পানি মিডল ইস্ট ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পোল্ট্রি পণ্য রপ্তানির চেষ্টা করছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের মান বজায় রাখতে আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।
সার্বিক মূল্যায়ন
২০২৫ সালে এসে পোল্ট্রি শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা জরুরি। নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং সরকারি নীতি সহায়তা থাকলে আগামীতে এই শিল্প আরও উন্নতি করবে।